Friday, February 29, 2008
সিলেটের হাকালুকি হাওর
প্রথম আলো পত্রিকায় গত ২৬ ফেব্রয়ারির নকশা পাতায় 'পাখির রাজ্য হাকালুকি' নামে একটি ফিচার বের হয়েছে। পড়ে বেশ ভাল লাগল।
পৃথিবীতে যেখানে একসঙ্গে ২০ হাজার পাখি দেখা যায় সে জায়গাটিকে বলে IBA বা Important Bird Aria আর সেখানে এক হাকালুকি হাওরে একসঙ্গে দেখা যায় এক লাখ থেকে দেড় লাখ পাখি। শীত মৌসুমের সময়ে হাকালুকিতে একসঙ্গে এত পাখি দেখা যায়, এতগুলো পাখি হাকালুকি হাওড়কে নিজেদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় মনে করে এ আনন্দ বা কৃতিত্ব আমাদের বাংলাদেশের সবার।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যরা সম্প্রতি সেখানে পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন পাখি 'মেটে মাথা টিটি' দেখতে পেয়েছে। ৮-৯০টির মতো দলবদ্ধ অবস্থায় এদেরকে দেখতে পাওয়া সত্যিই আনন্দদায়ক।
হাকালুকির ২৩৫টিরও বেশি বিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী পাখিরা এসে ভীড় জমায়, সাময়িক আবাস গড়ে তোলে। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
Thursday, February 21, 2008
বার্ড ফ্লু (Bird Flu) ২
এই লেখাটি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেছি। কিন্তু ঠিক কোন সাইট থেকে তা এই মুহূর্তে মনে পড়ছেনা। (রোগটির ভয়াবহতা ও এর প্রতি আমাদের সচেতনতা ও করণীয় বিবেচনা করে মূল লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতাসহ এখানে লেখাটি পুন:প্রকাশ করলাম।
বার্ড ফ্লু ভাইরাস কী?
বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন বা পাখি সম্পর্কিত রোগ একই। আর্থোমিক্সিরিডি গোত্রের ভাইরাস আক্রান্ত পাখিদের রোগ। মুরগি বা যেকোনো পাখি এই ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হয়। এই ভাইরাসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ১৮৭৮ সালে। ১৯৫৫ সালে ইতালিতে এই ভাইরাসে আক্রান্তকে ফাইল প্লেগ নামে পরিচিত করা হয়। বর্তমান নাম বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। এই ভাইরাসের অনেক সাব-টাইপ বা স্ট্রেন রয়েছে। এসব স্ট্রেনের মধ্যে এইচ-৫, এন-১ সবচেয়ে মারাত্মক। দ্রুত এক পাখি থেকে ঝাঁকের অন্য পাখিদের আক্রমণ করে। পাখির লালা ও মলের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার করে। আক্রান্ত পাখি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়।
কীভাবে ছড়ায়?
বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস পাখির অন্ত্রে বাস করে। বিষ্ঠা বা মলের সঙ্গে বের হয়ে আসে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস বা আক্রান্ত পাখির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে শ্লেষ্ক্না ও কফ আকারে বের হয়ে এসে সুস্থ পাখিদের আক্রমণ করে। অতিথি পাখিরা সাধারণত এই ভাইরাসের অন্যতম বাহক। আক্রান্ত পাখির বিচরণে, খামার যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও খামারের কর্মীদের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।
চেনার উপায়:
ভাইরাস আক্রমণের তিন থেকে ১০ দিন পর রোগের লক্ষণ পাওয়া যায়। আক্রান্ত পাখির পালক উসকোখুসকো হয়ে যায়। ক্ষুধামন্দা ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মাথার ঝুঁটির গোড়ায় রক্তক্ষরণ হয়। পায়ের পাতা ও হাফ-জয়েন্টের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে রক্ত জমে যায় ও রক্তক্ষরণ হয়। হঠাৎ করে মুরগির ডিম উৎপাদন হার কমে যায়ে। শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। মৃত্যুহার বেড়ে যায়।
- খামারে হঠাৎ করেই এ রোগ ছড়াতে পারে। একসঙ্গে অনেক মুরগি মারা যাবে। অসুস্থতার লক্ষণ ছাড়াই মারা যেতে পারে। অবসাদ, ঝিমুনি, ক্ষুধামন্দা, উসকোখুসকো পালক, জ্বর। এসব লক্ষণের পর মারা যেতে পারে।
- দুর্বলতা ও চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। আক্রান্তরা চুপচাপ বসে থাকে। মাথা মাটিতে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
- অল্প বয়সের মুরগিদের পক্ষাঘাত দেখা দেবে।
- ডিম পাড়া কমে যাবে; নরম খোসাযুক্ত ডিম পাড়ে।
- গলা ও মাথার ঝুঁটি ফুলে যায়। গাঢ় লাল বা নীল রং ধারণ করে এবং কখনো কখনো ক্ষুদ্র বিন্দুর রক্তক্ষরণ দেখা দেয়।
- আক্রান্তরা শ্বাসকষ্টে ভোগে।
- শরীরের পালকবিহীন অংশ যেমন পায়ে রানের নিচের অংশে রক্তক্ষরণ হবে।
- খামারে ১০০ ভাগ পর্যন্ত মোরগ-মুরগি মারা যায়।
- হাঁস ও রাজহাঁসদেরও একই লক্ষণ দেখা দেবে।
- অনেক ক্ষেত্রে হাঁস রোগের লক্ষণ ছাড়াই জীবাণু ছড়াতে পারে।
শরীরের ভেতরে পরিবর্তন:
- শরীরের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং হূৎপিন্ডের ভেতর ও বাইরে ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো রক্তক্ষরণ দেখা যায়।
- চামড়ার নিচে বিশেষ করে ঘাড়ে ও পায়ের গিরায় প্রচুর পানি জমে।
- মৃতদেহ পানিশুন্য হয়ে যেতে পারে।
- প্লীহা, বৃਆ, কলিজা এবং ফুসফুস ইত্যাদিতে ধুসর রঙের মৃত কোষ থাকতে পারে।
- বায়ুথলি অস্বচ্ছ হতে পারে এবং ধুসর বা হলুদাভ তরল পদার্থ পাওয়া যেতে পারে।
- প্লীহা বড় হতে পারে এবং রক্তক্ষরণের ফলে গাঢ় রং ধারণ করতে পারে।
একই লক্ষণের অন্য রোগ:
এসব রোগ-লক্ষণ বার্ড ফ্লু থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এসব রোগেও খামারের মুরগি দ্রুত মারা যায়।
- তীব্র রানিক্ষেত রোগ।
- ডাকপ্লেগ রোগ। মুরগির ডাকপ্লেগ হয় না।
- মুরগির সংক্রামক করাইজা।
- তীব্র বিষক্রিয়া।
কেন মারাত্মক:
এটি মারাত্মক রোগ। খামারের মুরগি দ্রুত মারা যেতে পারে। খামার থেকে খামার ও এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রোগগ্রস্ত মুরগি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটতে পারে। দুইভাবে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। অতিসংক্রামক হাইপ্যাথজেনিক এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ঐচঅও, আবার মৃদু সংক্রামক বা লোপ্যাথজেনিক খচঅও অবস্থায়ও ছড়াতে পারে।
খামারকর্মীদের সতর্কতা:
এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ ভাইরাসে প্রায় ২০০ মানুষ মারা গেছে। এদের সবাই খামারকর্মী। সে কারণে ভোক্তা নয়, খামারকর্মী ও আক্রান্ত খামারের মুরগি নিধনে নিয়োজিতদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। দরকারি বেশভুষা ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, পায়ে প্লাস্টি গাম বুট ও অ্যাপ্রোন পরতে হবে। শারীরিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। যারা জীবন্ত মুরগির বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত তাদেরও এসব পেশাক পরে থাকতে হবে। খামারে জীব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শেডে প্রবেশের সময় ফুটপথে জীবাণুনাশক মিশ্রিত পানি রাখতে হবে। এতে পা ধুয়ে খামারে প্রবেশ নিশ্চিত করা দরকার। খামার ও জীবন্ত মুরগির দোকানের চারপাশে নিয়মিত ফরমালিন বা শক্তিশালী জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। কোনোভাবেই অতিথি পাখিদের সংস্পর্শে আসা যাবে না।
প্রতিষেধক ওষুধ:
চীন ও ফ্রান্সসহ অনেক দেশই মুরগির এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য লাইভ ভ্যাকসিন আবিষ্ককার করেছে। চীনের স্টেট মিডিয়া জানায়, অরবিন রিসার্স ইনস্টিটিউট বার্ড ফ্লু প্রতিরোধে চার বছর গবেষণা করে লভি ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে। এই ভ্যাকসিন বার্ড ফ্লু ভাইরাসসহ রানিক্ষেত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করবে।
খামারের মুরগিদের এই ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে। বার্ড ফ্লু রোগে আক্রান্ত হাঁস-মুরগি ও কবুতরসহ কোনো পাখিরই কোনো চিকিৎসা নেই। উন্নত বিশ্বে এ রোগের টিকা দেওয়ার প্রথা চালু থাকলেও আমাদের দেশে এখনো এ টিকা আমদানি করার অনুমতি নেই। দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
রান্না মাংস-ডিমে ভয় নেই:
এই ভাইরাসে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশিষ্ট পশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মনজুর আজিজ বলেন, "আমরা যে তাপে মুরগির মাংস রান্না করি সেই তাপে কোনো জীবাণু বাঁচে না।
তা ছাড়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত মুরগি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। বাজার থেকে তাজা, সবল জীবন্ত মুরগি কিনলে তা পুরোপুরি নিরাপদ। আক্রান্ত মুরগি বাজার পর্যন্ত আনতে আনতে তাজা থাকবে না। তবে বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে অল্প সেদ্ধ মাংস বা ডিম না খাওয়াই ভালো। এ ছাড়া রান্নার আগে মাংস কাটার পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।"
খামারকর্মীদের শেডে কাজ করার সময় মাস্ক পরে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে। থুতু ফেলা যাবে না। কাজ শেষে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ও পা ভালো করে ধুয়ে ফেলা দরকার।
জীব-নিরাপত্তা জোরদারের বিকল্প নেই:
বায়ো সিকিউরিটি বা জীব-নিরাপত্তা একটি সাধারণ জ্ঞান। এক কথায় জীব নিরাপত্তা হলো খামারের মুরগি ও খামারকর্মীদের রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখা। জীব-নিরাপত্তা নিতে অতিরিক্ত কোনো খরচ হয় না। এটি মূলত আচরণবিধি। এর ফলে রোগজীবাণু থেকে খামার রক্ষা পাবে এবং হাঁস-মুরগি রোগজীবাণু থেকে মুক্ত থাকবে।
খামারের হাঁস-মুরগি সব সময় ভালো জায়গায় রাখতে হবে। ভালো জায়গা হলো পরিষ্ককার পানি ও খাবারের ব্যবস্থা আছে এমন জায়গা; যেখানে নিয়মিত টিকা ও ওষুধপথ্যের ব্যবস্থাও আছে।হাঁস-মুরগি সব সময় সংরক্ষিত ঘেরা জায়গায় রাখতে হবে।
খামারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দর্শনার্থীদের জুতা-স্যান্ডেল, ছাগল, ভেড়া, বন্য পাখি রিকশাভ্যান ও মোটর গাড়ির মাধ্যমে আক্রান্ত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার খামারে রোগ ছড়াতে পারে। সে জন্য দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হবে।
পাশের খামারে যদি রোগ দেখা দেয়:
পাশের খামারে এই রোগ দেখা দিলে বুঝতে হবে, আপনার খামার এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। মনে রাখতে হবে, আপনার খামারটিও আক্রান্ত হতে পারে। তবে এ সময় অধৈর্য না হয়ে ঠান্ডা মাথায় কতগুলো মৌলিক নীতি অবলম্বন করতে হবে।
খামারের হাঁস-মুরগির জন্য সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নতুর হাঁস-মুরগি কিনবেন না। বহিরাগতদের কোনোভাবেই খামার শেডের কাছে আসতে দেওয়া যাবে না। খামারের আশপাশ, শেড, শেডের প্রত্যেকটি যন্ত্রপাতি এমনকি সাইকেল, মোটরসাইকেল নিয়মিত পরিষ্ককার রাখতে হবে। খামারের বর্জ্য ও বিষ্ঠা সুরক্ষিত জায়গায় রাখতে হবে।
যদি মড়ক লাগে:
খামারে মুরগির মৃত্যু বা মড়ক অনেক সময়ই হয় ও হতে পারে। যে কারণেই মড়ক লাগুক না কেন, দ্রুত নিকটস্থ পশুসম্পদ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। মনে রাখবেন, চোখে দেখে কোনোভাবেই বোঝা যাবে না মৃত্যুর কারণ বার্ড ফ্লু ভাইরাস কি না। রোগের কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য অবশ্যই ল্যাবরেটরি টেস্ট করাতে হবে। পাশুসম্পদ হাসপাতালের চিকিৎসক নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরিতে রক্তের নমুনা পাঠিয়ে পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর আপনাকে নিশ্চিত করবেন রোগের কারণ কী। যদি বার্ড ফ্লু ভাইরাস পাওয়া যায়, তাহলে নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে খামারের মুরগি নিধন ও ডিম নষ্ট করতে হবে এবং খামারের বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
করণীয়:
- মুরগির মাংস ও ডিম ভালোভাবে রান্না ও সেদ্ধ করে খেতে হবে।
- খাওয়ার আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
- ডিম ফ্রিজে রাখার আগে হালকা গরম পানি বা ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ধুয়ে রাখতে হবে।
- বাড়ির হাঁস-মুরগি খাঁচায় ভরে রাখুন বা কোনো নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না।
- খামারে কাজ করার সময় মাস্ক, গ্লাভস বা দস্তানা এবং অ্যাপ্রোন পরে কাজ করতে হবে।
- খামারের ফুটপথে পা ধুয়ে প্রবেশ করুন।
- হঠাৎ জাবর কাশি, গলার স্বর ভেঙে গেলে, চোখে কোনো সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
অনুচিত:
- অতিথি পাখিদের শিকার ও খাওয়া যাবে না।
- মুরগি কাটার ছুরি, বঁটি ও মাংস রাখার পাত্র গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে রাখতে হবে।
- জীবন্ত মুরগি ছাড়া কোনো রোগগ্রস্ত মুরগি, হাঁস, কবুতর কেনা বা খাওয়া যাবে না।
- খামার শেড থেকে শিশুদের দুরে রাখতে হবে।
- খামারের অসুস্থ মুরগি খাওয়া যাবে না।
- গুজব বিশ্বাস করা যাবে না।
অতিথি নয় পরিযায়ী
কয়েকদিন আগে প্রথমে আলোতে পরিযায়ী পাখি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ড. রেজা খান এর একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির চুম্বক অংশ এখানে প্রকাশ করলাম।
পরিযায়ী পাখিরা ‘বিদেশি পাখি’ নয়
ড. রেজা খান
(দুবাই চিড়িয়াখানার প্রধান)
ধরুন, বামন চা পাখি বা লিট্ল স্টিন্ট সাইবেরিয়ায় প্রজননের পরপর অক্টোবরে দক্ষিণের দিকে ওড়া শুরু করে। এদের একটি দল চীন, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, ভারত হয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশের নানা এলাকায়। অন্য দল চলে যায় রাশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল ও চীন হয়ে জাপানের দিকে। এদের আরেক দল ছোটে পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপে, সেখান থেকে আফ্রিকার দিকে। ধারণা করা হয়, এদের কিছু অংশ ভারত হয়ে এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যাত্রা করে বাংলাদেশ পেরিয়ে যায়।
পরিযায়ী পাখিরা প্রধানত শীতের সময় এলেও অনেকে এ দেশে আসে বসন্ত ও শরৎকালে। অনেকে এ দেশে আসে কেবলই গ্রীষ্ম। শীতকালে পরিযায়ী পাখি বেশি চোখে পড়ে বলে সবাই এদের শীতের পাখি বলে ডাকে। এই ভুল সম্বোধন পরিহার করা দরকার।
পরিযায়ীদের নামবিভ্রান্তি
পাখি সম্পর্কে অজ্ঞানতার ফলে অনেকে পরিযায়ী পাখিদের ‘অতিথি পাখি’, ‘মেহমান পাখি’ বা ‘বিদেশি পাখি’ বলে আখ্যায়িত করছেন। অজ্ঞানতা এত দুর গেছে যে এক সাবেক প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী অতিথি পাখিরা কারও নিমন্ত্রণে আসেনি বলে সেগুলোকে মেরে খাওয়ার আহ্বান জানান!
পরিযায়ী পাখি বলতে বাংলাদেশে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় কেবল শীতকালে আসা হাঁস ও রাজহাঁসকে। সাধারণ মানুষ শীতকালে জনপথে বিক্রি হওয়া কালিম, ডাহুক, কোড়া ও সরালী পাখিকেও শীতের পাখি মনে করে। অথচ এসব পাখি আমাদের দেশের বাসিন্দা বা রেসিডেন্ট প্রজাতি। দেশে আবাসস্থলের অভাব হওয়ায় এরা এখন বেশির ভাগ সময় পাশের দেশ ভারত ও মিয়ানমারে কাটায়। শীতকালে এরা সেখান থেকে আমাদের জলাভূমিতে নেমে আসে। এদের কিছু নমুনা এখনো বাংলাদেশে প্রজনন করে।
পরিযায়ী নানা পাখি
গুটিকয় চিল, শকুন ও বাজ বাদ দিলে আমাদের দিবাভাগের অনেক শিকারি পাখিই পরিযায়ী। এদের মূল দল বাংলাদেশ পাড়ি দেয় শীতে। মোহনা, হাওর অঞ্চল ও হাওরের বৃহত্তম ইগল (ইম্পেরিয়াল ইগল), বড় ও ছোট চিত্রা ইগল (গ্রেটার ও লেসার স্পটেড ইগল), বাদামি বা খয়েরি ইগল (স্টেপি ও টওনি ইগল) ও মেছো ইগল বা অস্প্রে দেখা যায় বেশ ; অন্যত্র ডোরাবুক ভুবনচিল (লাইনিয়েটেড কাইট), কাটুয়া চিল (বুটেড ইগল), বোনেলির ইগল (বোনেল্লিস ইগল), জলার চিল ও রাখালভুলানি (হ্যারিয়ার), কালো শকুন (সিনেরিয়াস বা ব্ল্যাক ভালচার), তুরমুতি ও শাহিন (ফ্যালকনস) ইত্যাদি। নিশাচর শিকারি পাখির মধ্যে পেঁচারও কয়েকটি প্রজাতি পরিযায়ী।
বড় বড় জলাশয়, হাওর, চর, মোহনা, উপকুলীয় এলাকা ও দ্বীপাঞ্চলে হাজারে হাজারে আসত জলকবুতর, গঙ্গাকইতর, বদর বা বদরশাহর কবুতর ও গাঙচিল। সমুদ্রসীমানায় কোনো জেলেপল্লী মানেই ছিল শত শত গঙ্গাকইতরের ভিড়। জেলে নৌকা আর ট্রলারগুলোর পিছু নিত অসংখ্য গাঙচিল। শীতের প্রধান জলচর প্রজাতিগুলো হলো গঙ্গাকইতর বা বদর (ব্রাউনহেডেড গাল), কালোমাথা গঙ্গাকইতর (ব্ল্যাকহেডেড গাল), জলকবুতর (ইয়েলোলেগ্ড গাল) ও বড় জলকবুতর (প্যালাসেস গাল)। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গঙ্গাকইতর। ঢাকার বুড়িগঙ্গায় এদের দেখা যায় বেশ। এর পরপর আছে জলকবুতর।
শরৎ বা বসন্তেও এ দুই প্রজাতিকে মোহনা অঞ্চলে ক্বচিৎ দেখা যেতে পারে। জলকবুতর বা গঙ্গাকইতরের কোনো প্রজাতি আমাদের সীমানায় প্রজনন করে না। গাঙচিলের কিছু প্রজাতি এখনো প্রজনন করে। কিছু প্রজাতি আগে করত, এখন আর করে না।
খোঁপাযুক্ত মাঝারি গাঙচিল (লেসার ক্রেস্টেড টার্ন), খোঁপাযুক্ত বৃহৎ গাঙচিল (গ্রেটার ক্রেস্টেড টার্ন) ও বৃহৎ গাঙচিল (ক্যাস্পিয়ান টার্ন) দেখা যায় শুধু উপকুলীয় এলাকায়; মাঝারি গাঙচিল (কমন টার্ন) ও বড়ঠোঁটি গাঙচিল (গালবিল্ড টার্ন) বড় বড় জলাশয়ে। এরা সবাই আসে শীতে।
বক, কোদালি বক, কাস্তেচরা, সারস, হাড়গিলা, মদনটাক, শামুকখোল ইত্যাদির লম্বা লম্বা পা, গলা আর ঠোঁট। এদের বলা হয় ওয়েডিং বার্ডস, পানি কেটে বা ভেঙে চলা পাখি। এদের মধ্যে পরিযায়ীর দলে পড়ে কোদালি বা খুন্তেবক (স্পুনবিল), কাস্তেচরার (আইবিস) দু-একটি প্রজাতি, সারসের (স্টর্ক) সব কয়টি প্রজাতি এবং মোহনা ও জলাভুমিতে দেখতে পাওয়া ধুসর বক (গ্রে হেরন)। পরিযায়ী কাস্তেচরা ও সারস বিরল; বাকিরা সুলভ।
প্রজননকারী পরিযায়ী
চাতক, পাপিয়া, সরগম, লালপাখা কোকিল, রঙিলা চ্যাগা, ঘুরঘুর খায়েরি ও সুমচার দলকে আমরা বিবেচনা করতে পারি প্রজননকারী পরিযায়ী পাখি হিসেবে। এরা আমাদের দেশে আসে এপ্রিল-মে থেকে জুলাই-আগস্টে। এদের মধ্যে প্রথম চারটি কোকিলগোত্রীয় এবং সব কয়টিই বাসা-পরজীবী। অর্থাৎ এরা নিজেরা বাসা বানায় না, অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। সে বাসার পালক পাখি মা-বাবা ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে নিজের বাচ্চা ভেবে কোকিলছানাদের খাইয়ে বড় করে। বাচ্চা বড় হয়ে নিজের রূপ ধারণ করলে পালক মা-বাবা তাদের তাড়িয়ে দেয়। পাখিরা তত দিনে মিয়ানমার বা ভারতে উড়ে যেতে সক্ষম হয়ে উঠেছে। এ ঘটনা সাংবৎসরিক। এসব কোকিল তাই পরিযায়ী পাখি। আমাদের অতি পরিচিত কালো কোকিল, চোখ গেল, সরগম ও বউ-কথা-কও পাখি স্থানীয় প্রজাতি।
আরও কত পাখি
আমরা সচরাচর দেখি না এমন অসংখ্য পরিযায়ী পাখি শরতের শেষে আসতে শুরু করে। ভরা শীতে তাদের আগমন তুঙ্গে ওঠে, ভাটা পড়ে বসন্তে। এ দলে প্রধান হলো খঞ্জনি বা ওয়াগটেইল, তুলিকা বা পিপিট, কসাইপাখি বা শ্রাইখ, ফুটকি বা পাতাফটুকি, লিফ ওয়ার্বলার, চটক বা ফ্লাইক্যাচার, বঘেরি, মাঠচড়াই, ধুলচড়াই বা বান্টিং, ফিনচেস ও লার্কস। দেশের যেকোনো বাগবাগিচা, উঠানের কামিনী, জবা, পাতাবাহার, জুঁই, গন্ধরাজ, গোলাপ, বাগানবিলাস, কাঠগোলাপ এবং অন্যান্য ফুল-ফলগাছের ওপর দিয়ে ও ক্ষেতখামার মাড়িয়ে চলে যায় এরা। এরা আকারে ছোট, বেশির ভাগই বাবুই-চড়ুই পাখির মতো। রং বাহারি নয় বলে আমাদের চোখেই পড়ে না। তাই ঝাঁকে ঝাঁকে আসা এসব পরিযায়ী পাখি আমাদের তালিকায়ও ঠাঁই পায় না।
এসব পাখির একটিকেও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিনদেশী বা অতিথি পাখি বলা যাবে না। কারণ, এরা আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থার অচ্ছেদ্য অংশ। শীত, গ্রীষ্ম, শরৎ ও হেমন্তে আমাদের ভূখন্ড এদের পাড়ি দিতেই হবে। সময়মতো এরা ফিবছর আমাদের এখানে আসবে, সময়মতো চলেও যাবে।
এবারের শীতের পরিযায়ী
সিডরের অপ্রত্যাশিত হামলার কারণে এবার শীতে যে শতসহস্র পরিযায়ী পাখি আমাদের হাওর, বাঁওড়, বিল, চরাঞ্চল, মোহনা ও কাপ্তাই হ্রদে এসেছে; তাদের খবর ফিবছরের মতো মিডিয়ায় তেমন জায়গা করে নিতে পারেনি। সামান্য খবর যা হয়েছে, তার সবই প্রায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা সরালী হাঁস এবং একটি হাওরে পরিবেশ বিভাগের শীতকালীন পাখি গণনা নিয়ে।
সচরাচর দেখা প্রজাতিগুলোর মধ্যে ঢাকার আশপাশের বিল, দিঘি বা হ্রদের প্রায় ৯০ শতাংশই সরালী, গেছোহাঁস বা লেসার হুস্টিলিং ডাক বা ট্রি ডাক। সঙ্গে আছে দু-চারটি বড় সরালী বা ফুলভাস বা গ্রেটার হুস্টিলিং ডাক, চখাচখি, দু-একটি লেন্জা (পিনটেইল), বামুনিয়া হাঁস (কমন পোচারড), ভুতিহাঁস (ফেরুজিনাস ডাক), বড় ভুতিহাঁস (বেয়ারসস পোচারড), কালো হাঁস (টাফটেড ডাক), জিরিয়া হাঁস (গারগেনি), পিয়ং হাঁস (গ্যাডওয়াল), লালশির (উইজিয়ন), নীলশির (ম্যালারড), পাতারি হাঁস (কমন টিল), পান্তামুখী বা খুন্তেহাঁস (শোভেলার) ইত্যাদি।
সরালী বাদে বাকিগুলো পরিযায়ী পাখি। এরা আমাদের মিঠা ও লোনা পানির জলাভুমিতে আসে। চলে যায় নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে। তিন-চার প্রজাতির রাজহাঁস আসে কেবল শীতে; বড় বড় নদীর চরে, মোহনায়, হাওরে, কাপ্তাই হ্রদে। শাচকার একটি বড় দল দেখা যায় দেশের মোহনা ও উপকুলীয় এলাকায়। ভুতিহাঁস, পিয়ং হাঁস, লালশির, বড় ভুতিহাঁস, পান্তামুখী বা খুন্তেহাঁস, চখাচখির বড় দল দেখা যায় বড় বড় হাওর, কাপ্তাই হ্রদ ও বড় নদীতে। বোঁচা বা ঘড়যুক্ত হাঁস (কোম্ব ডাক) মূলত স্থানীয় পাখির প্রজাতি। প্রজননের পরিবেশ লোপ পাওয়ায় এদের সংখ্যা এত কমেছে যে এরা এখন পরিযায়ীর দলে পড়ে। দেখাও যায় শীতের সময়ই বেশি।
হাঁস, সরালী, রাজহাঁস, চখাচখি বাদ দিলে আর যে বড় পাখির দলটি শীতকালে আমাদের পানিবহুল অঞ্চল দিয়ে যায় বা ওখানে কিছু সময় থাকে, ওদের আমরা জলচর বা জলাভুমির পাখি হিসেবে জানি। স্থানীয়ভাবে এদের পরিচয় চা-পাখি (স্যান্ডপাইপার স্টিন্ট), ঢেঙ্গা (শ্যাংক, স্টিল্ট), গুলিন্দা (কারলিউ), বাটান (প্লোভার), জৌরালি (গডউইট), জোয়ালা (রাফ অ্যান্ড রিভ), কাদাখোঁচা (স্মাইপ) এবং হট-টি-টি (ল্যাপউইং)। হাঁস বা রাজহাঁস দেখা যাক বা না যাক, জলাভুমির পাখির কিছু নমুনা−বিশেষ করে চা-পাখি, খঞ্জনি ও কসাই পাখি−দেখা যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের পুকুর, থানচি, বান্দরবানের গির্জার ছোট্ট চৌবাচ্চায়।
সবার কাছে তাই আবেদন, শীতকালে দেখা বা বিভিন্ন ঋতুতে স্বল্প থেকে দীর্ঘ সময়জুড়ে বাংলাদেশে ঠাঁই নেওয়া পাখিগুলোকে অতিথি পাখি, শীতের পাখি বা বিদেশি পাখি বলে আখ্যায়িত করে তাদের যেন আমরা পর করে না ফেলি। এরা শীত, বসন্ত, শরৎ বা গ্রীষ্মের পরিযায়ী পাখি। এ দেশেরই পরিযায়ী পাখি, এ দেশের প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণচক্রের অচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের জাতীয় প্রাকৃতিক বন্যপ্রাণী-সম্পদের এক বড় হিস্যা।