Showing posts with label সচেতনতা. Show all posts
Showing posts with label সচেতনতা. Show all posts

Friday, January 16, 2009

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থা

আজকের প্রথম আলোতে "নতুন সরকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তা" নামে একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রবন্ধটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থা কিরূপ হতে পারে সে বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। লেখক মাহবুবা নাসরীন বলেন:

শুধু কৃষি উন্নয়ন এককভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। বিশ্বের ধনী দেশগুলো তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে যেভাবে ভুমিকা রাখছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যারা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আইপিসিসির তথ্য অনুযায়ী, এই শতকের শেষে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। রবি শস্যের সময়ে বা শীতকালে বর্ষা মৌসুমের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হবে। একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় শস্য উৎপাদন শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত কমতে পারে। তাই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিগুলোর দিকেই প্রধানত দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেশব্যবস্থা, বনসম্পদ, মাটি, জলধারা, জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রক্ষা করা, ভুমিধস রোধ করা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মাটি উপযোগী, দুর্যোগের সঙ্গে খাপখাইয়ে নিতে পারে এ ধরনের খাদ্য উৎপাদনে অধিকতর মনোযোগী হওয়া, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে সঠিক পন্থা বের করার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে এগোতে হবে।
যদিও সরকারকে পরামর্শ দেয়া প্রবন্ধটির উদ্দেশ্য। কিন্তু সাধারণ পাঠকের জন্য যে তথ্য এখানে উপস্থাপিত হয়েছে, তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। প্রবন্ধটির পাঠকপ্রিয়তা প্রত্যাশা করি।

Sunday, November 23, 2008

কুয়াশার তীব্রতা

ইদানীং প্রায় প্রতিদিন ভোরবেলায় প্রচুর কুয়াশা পড়ছে। এর কিছু চিত্র আমি এখানে রেখে দিয়েছি। এই সময়ে এত ঘন হয়ে কুয়াশা পড়ার কথা নয়। অন্যান্য বছরগুলোতে অগ্রহায়ণ মাসের এই সূচনা লগ্নে ঠাণ্ডার পরশ লাগে। কুয়াশার হালকা ছোঁয়া লাগে। কিন্তু এমন ঘন হয়ে কুয়াশা পড়তে দেখা যায় না। এবারের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের এমন কারণ ব্যাখ্যা করেছেন আবহাওয়াবিদরা। তাদের মতে এবারে হেমন্তকালের সার্বিক তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অন্যান্য বৎসরগুলোতে এই সময় রোদের তাপ কিছুটা বেশি থাকে। ফলে মাটির উপরিতলের জল শুকিয়ে যায়। কিন্তু এবার তা হতে পারেনি। খাল বিল নদী নালা সহ মাটির উপরিভাগের জল শুকিয়ে না যাওয়ার কারণে একটু শীত পড়ার সাথে সাথেপ্রচুর পরিমাণ কুয়াশার সৃষ্টি হচ্ছে। আর ফলে শীতের তীব্রতাও অনুভূত হচ্ছে। কোন কোন আবহাওয়াবিদ বলেন এবার শীতকালে শীতের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে বেশি হবে।

এই সমস্যা তৈরি করেছে মানুষ নিজে। কয়েকদিন আগে CNN এ একটা ভ্রমণকাহিনী দেখছিলাম। কানাডার কোন এক শহর থেকে বরফভাঙ্গা জাহাজে উত্তরমেরু অভিমুখে যাত্রা করেছে কয়েকজন বিজ্ঞানী। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত গত ২০ বৎসরের ছবি থেকে দেখা গেছে উত্তরমেরুর বরফের পরিমাণ ২০০৭ সালে ছিল সবচাইতে কম। এটা কোন সাধারণ বিপদ নয়। এর অর্থ পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। বরফ গলতে শুরু করেছে। বরফ গলার হার এমন থাকলে আগামী ৩০-৪০ বৎসরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক মিটার বেড়ে যাবে। নিউইয়র্কের মতো সমুদ্রতীরবর্তি শহরগুলো জলে ডুবে যাবে। বাংলাদেশের মতো (তারা শুধুমাত্র বাংলাদেশের কথা ও এনিমেশন দেখিয়েছে) সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলোর নীচু জায়গাগুলো বিশেষ করে ভাটি অঞ্চলের ব্যাপক অংশ সমুদ্রের জলে তলিয়ে যাবে। একজন বিজ্ঞানী বলছিলেন: প্রকৃতি নিজে থেকে পরিবর্তিত হয় না, মানুষ তাকে পরিবর্তন করে। এর প্রভাব পড়বে আবহাওয়ামণ্ডলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বজ্রপাতসহ ঝড়বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে। বিশেষ করে টর্ণেডোর সংখ্যা বেড়ে যাবে। আবার তার বিপরীত ঘটনার পরিমাণও বাড়বে। কোন কোন জায়গায় শীতের তীব্রতা পূর্ববর্তী বৎসরগুলোর তুলনায় বেশি হবে।

পৃথিবীজুড়ে জীবাস্ম জ্বালানী এখন যে পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে তার পরিমাণ কমানো প্রয়োজন। আরো বেশি পরিমাণে গাছ লাগানো দরকার। মানুষের লোভ আজ ক্ষতি করছে মানুষকেই। এই সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু উন্নয়নশীলদেশগুলোতে তার কোন প্রভাব পড়ছে না।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সবজায়গায় এবার কুয়াশা বেশি পড়ছে। এটাও কি আন্তর্জাতিক আবহাওয়াগত পরিবর্তনের কোন প্রভাব? আমরাও কি অবশেষে ক্ষুব্ধ প্রকৃতির রোষের মুখে পড়লাম?

Thursday, September 11, 2008

হাতি কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

১০ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখের ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি কলামে হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে কি না সে বিষয়ে প্রখ্যাত নিসর্গবিদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া প্রশ্ন রেখেছেন।
প্রবন্ধটি ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনপূর্বক সম্পূর্ণ তুলে ধরলাম।

প্রাণী : হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

হাতি অচিরে, অদূর ভবিষ্যতে লুপ্ত হয়ে যাবে। বুনো হাতি তার আবাস বন ছেড়ে ঘন ঘন লোকালয়ে নেমে আসায় এই অর্থই প্রকাশ করে। এর প্রধান কারণ এদের আবাস বা হ্যাবিট্যাট-এর ক্রমাবনতি। আমাদের দেশে হাতিদের প্রধান বিপদ আসছে তাদের আবাসস্থলের সঙ্কোচন ও অবস্থার ক্রমাবনতির জন্য। চোরাগোপ্তা হাতি শিকারিদের আক্রমণ থাকলেও তার জন্য নয়।

নাগা, কুকি, মিজো ও আরও কিছু আদিবাসীরা হাতির মাংস খুব পছন্দ করে। এজন্য মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও তাদের সংলগ্ন অঞ্চলে হাতি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ইত্তেফাক পত্রিকার কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অফিস থেকে ২৮ ও ২৯ আগস্ট পর পর দু’দিন কক্সবাজারের নাইক্ষংছড়ি ও চট্টগ্রামের বাঁশখালি, বোয়ালখালি, রাঙ্গুনীয়া, লোহাগড়া প্রভৃতি এলাকায় গত পাঁচ বছরে হাতির উৎপাতের খতিয়ান দিয়েছে। তাদের মতে, এই সময়ের মধ্যে বুনো হাতির আক্রমণে শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। আহত হয়েছে তার চেয়েও বেশি।

প্রাচীনকাল থেকে চট্টগ্রাম ও সন্নিহিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে হাতি যূথবদ্ধ হয়ে বিচরণ করছে। ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম, আরাকান-বার্মাসহ এই অঞ্চল বুনো হাতির প্রাকৃতিক আবাস। আরাকান-বার্মার সাদা হাতিও এখানে থাকত। তখন শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২০০ হাতি ছিল। আবার এরা দেশান্তরীও হত। খেদা দিয়ে এসব হাতি ধরে শিক্ষা দিয়ে পোষ মানানো হত। চট্টগ্রাম জেলা কর্তৃপক্ষ খেদা দেয়ার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করত। প্রতিটি হাতির জন্য তাদের ৭৫০ টাকা সরকারকে দিতে হত। খেদার কাজে ১০০ থেকে ১৫০ লোক নিয়োজিত হত। খেদায় পড়া হাতিদের ২৪ ঘণ্টা খাবার ও পানি দেয়া হত না। তারা তখন শক্ত খুঁটির ঘেরার ফাঁক দিয়ে নাক বের করে একে একে সাহায্য চাইত। সেখানে শিক্ষিত হাতি নিয়ে থাকত মাহুতেরা। আস্তে তারা বুনোদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসত।

১৯৮৫ সালে ভারতে ১৭ থেকে ২১ হাজার হাতি ছিল। সেখানে এখন আছে হয়তো অর্ধেকের কম। বাংলাদেশে ৩০০ হাতি আছে বলে ধরা হয়। আর আকবরের সময় ছিল ৩২ হাজার। জাহাঙ্গীরের সময় এক লাখ ত্রিশ হাজার। আর আমাদের ৩০০ হাতি অচিরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন ৫০টি হাতি সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। এরপর হাতি চলে যাবে চিড়িয়াখানায়। পৃথিবীর বহু দেশে যেমন শুধু চিড়িয়াখানাতেই রয়েছে। তারপর থাকবে শুধু বইপত্রে যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট-ময়মনসিংহ অঞ্চলে এক সময় গন্ডার ছিল।

শেরপুর, নেত্রকোনার উত্তরে ভারতের মেঘালয় থেকে হাতি এসে উৎপাত করে। সেখানে তিন হাজারের মতো হাতি আছে বলে মনে করা হয়, আর আমাদের সারাদেশে আছে মাত্র তিনশো। মেঘালয়ে বালফাক্রাম জাতীয় উদ্যান করা হয়েছে দুশো বর্গ কিমি জমি নিয়ে। সেখানে শুকনো মরসুমে এক হাজার পর্যন্ত হাতি জড়ো হয়। বর্ষা নামলেই হাতি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় হাতির প্রজননকাল।

এখন হাতি এসে কক্সবাজার থেকে রাঙ্গুনীয়া পর্যন্ত উৎপাত করছে। নেত্রকোনা শেরপুর অঞ্চলেও করছে। হাতিদের প্রধান দাবি দিনদুনিয়ার মালিক বলে দাবিদার মানুষের কাছে, আমাদের কথা একটু ভাবুন, আমাদের অরণ্য দাও থাকা ও খাওয়ার জন্য। আর আমাদের থাকার জায়গায় যদি আপনারা ঘর ও চাষবাস করেন তাহলে আমাদেরই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে বৈকি! কারণ আমাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। এই পৃথিবীর উপর সকল জীবজন্তু, পাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ, সাপ ও মাছ সবার হক আছে। সে জন্য যদি আমরা পথ ভুলে বোয়ালখালি থানা থেকে কর্ণফুলী পার হয়ে কালুরঘাট চলে এসে আস্তানা খুঁজি? বলা তো যায় না, মাস্টারদা সূর্য সেনের জালালাবাদ পাহাড়ে বসত খুঁজি? বাটালি পাহাড়, টাইগার পাস, দিয়াং পাহাড়ে চলে আসি? ওসব এলাকায় এক সময় আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন। এতই যদি আঁতকে ওঠেন তবে মাথা ঠাণ্ডা করে আমাদের কাপ্তাই, ওয়াগ্গা, সীতা পাহাড় ছেড়ে দিন। আমাদের অবাধে চলার অভয়ারণ্য দিন। আপনারা বাড়তে বাড়তে ১৫ কোটি হয়েছেন, আমরা কমতে কমতে ৩০০ হবো কেন? জ্ঞানী-গুণী বলে পরিচিত আপনারা, আর একটু ভাবুন আমাদের হাতি জাতির কথা। পার্বত্য চট্টগ্রামে লাখ লাখ মানুষ এনে গুঁজে দিচ্ছেন, পাহাড়-অরণ্য শেষ করে দিচ্ছে তারা, কর্ণফুলীতে বাঁধ দিয়ে ঘন ঘাসের বন ডুবিয়ে দিয়েছেন, পাহাড়ী মানুষ ও পাহাড়ী জীবজন্তুর কথা একবার কি ভেবে দেখেছেন? কোনো প্রকল্প নিয়েছেন লুপ্ত হয়ে যাওয়া এখানকার বাঘ, চিতাবাঘ, গন্ডার, সম্বার, নীলগাই, উড়ন্ত কাঠবিড়ালী, হনুমান, ময়ূর, রামকুত্তা, গৌর, চিত্রা-হরিণ, মায়া হরিণ, বাদি হাঁস, বনমোরগের কথা? শুনছি সুন্দরবনে বাঘ নাকি আছে ৩০০ মাত্র।

আমরা হাতিরা যদি না থাকি, অরণ্য যদি না থাকে, হে মানুষ! উৎসবে ও আনন্দে, কল্পনায় ও স্বপ্নে, মধুচন্দ্রিমা এবং অনিবার্য সন্তানদের নিয়ে তখন কার কাছে যাবেন? বলুন! বলো মানুষ, তোমরা আসলে কী চাও?

[লেখক: কথাসাহিত্যিক ও নিসর্গী]

Thursday, August 14, 2008

পৃথিবীকে আরও শীতল রাখুন

দিনে দিনে যেভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডলের এই সমস্যা কিন্তু প্রাকৃতিক কোন কারণে তৈরি হয় নি। এর প্রধান কারণ হল মানুষের অতিরিক্ত আরামপ্রিয়তা ও অসচেতনতা। মানুষ নিজেদের আরাম ও আয়েশের প্রয়োজনে, পৃথিবীর কথা না ভেবে দিনে দিনে বায়ুমণ্ডলে নানারকম ক্ষতি করে চলেছে। বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, ওজনস্তর ক্ষয়ে যাচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে একটা গ্রীন হাউজ ইফেক্ট(Green House Effect)। এর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। একারণে মেরু অঞ্চলে বরফগুলো গলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। প্রতিক্রিয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলোর উপর। অথচ আমরা একটু সচেতন হলেই এই সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া যায়। আমরা যদি একটু কম আয়েশী হই। পৃথিবীর প্রতি আমাদের মমত্ববোধ আর একটু বাড়াই, তাহলেই সম্ভব পৃথিবীকে আর একটু শীতল রাখা। আমরা বিভিন্নভাবে এটা করতে পারি।

  • সাধারণ বাল্বের পরিবর্তে এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করে।
  • রুম থেকে বের হয়ে যাবার সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো বন্ধ করে (যেমন: বাল্ব বা ফ্যান)।
  • বাথরুমে স্নানের সময় কমিয়ে অর্থাৎ কম জল খরচ করে।
  • বৈদ্যুতিক তারগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করে। অর্থাৎ কোথাও যেন লিকেজ না থাকে, সেটা নিশ্চিত করে।
  • বাড়ির আশেপাশে আরও বেশি পরিমাণে গাছ লাগিয়ে।
  • যখন ব্যবহার হবে না, তখন বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলোর প্লাগ সকেট থেকে খুলে ফেলে।
  • রিসাইকেলযোগ্য বাজারের ব্যাগ ব্যবহার করে।
  • স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করে।
আসলে সদিচ্ছাটাই বড়। এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হবে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই। আমরা নিজেরাই যদি এর যাবতীয় সুবিধাটুকু ভোগ করে শেষ করে ফেলি তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কি রেখে যাব? তাদের জন্য আমরা কি একটি সুস্থ, সুন্দর, স্বাস্থ্যকর, বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাবার কথা চিন্তা করতে পারি না?

আমি National Wildlife এর newsletter এর সদস্য। ওদের কাছ থেকে নিয়মিত বিভিন্ন রকমের খবর পাই। আজকেও পেলাম। তারা বলছিল আরও কিভাবে এই পৃথিবীর ভাল প্রতিবেশী হওয়া যায়। অন্ততঃ তিনটি পদ্ধতি ব্যবহার করলে পৃথিবীকে একটু শীতল রাখতে সহায়তা করা যায়। একটি লিংক দিয়েছে, যেখানে ভিজিট করলে সিলেক্ট করার মত বেশ কয়েকটা অপশন আসে। সেগুলোতে ক্লিক করে তাদেরকে সামান্য কিছু ডলার দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে। আমার দেয়ার মত ডলার নেই। কিন্তু পড়ে যা বুঝলাম তাতে সত্যিই এই পৃথিবীর আবহাওয়াকে শান্ত রাখতে আমাদের করার মত অনেক কিছুই রয়েছে। শুধু দরকার এই পৃথিবীমাতার প্রতি আর একটু বেশি ভালবাসা।

ছবি নেয়া হয়েছে National Wildlife এর ই মেইল থেকে।

Friday, July 25, 2008

সর্বনাশা কীটনাশক

কয়েকদিন আগের প্রথম আলো পত্রিকায় নিম্নোক্ত খবরটি পেলাম। ভয়ানক একটি ঘটনা পত্রিকা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করে ফেলেছেন। আমরা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে দেশ, জাতি তথা প্রকৃতির কতই না ক্ষতি করে চলেছি। খবরটি পাঠ করে আমার মনে হয়েছে, সত্যিই আমরা কতই না বোকা!

নষ্ট হচ্ছে মাটি, মারা যাচ্ছে পাখি ও উপকারী কীট-পতঙ্গ
সাজ্জাদ হোসেন

নির্বিচারে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ বিপন্ন। খোদ ২০০২ সালে ঘোষিত সরকারের সমন্বিত বালাই-ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালাতেও রাসায়নিক বালাইনাশকের ভয়াবহ ক্ষতির কথা স্বীকার করা হয়। নীতিমালার শুরুতেই বলা হয়, ‘অতীতে কৃষিক্ষেত্রে বালাই নিয়ন্ত্রণের জন্য বালাইনাশককে মহৌষধ হিসেবে গণ্য করা হতো। যদিও বালাইনাশক ব্যবহারে বালাই থেকে সাময়িক পরিত্রাণ পাওয়া যায়, কিন্তু বর্তমানে এ ধারণাই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য যে, বালাইনাশকের বাছবিচারহীন ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং এর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কৃষি উৎপাদনের ভিত নষ্ট করে দেয়। রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক বালাইনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার এ দেশের কৃষি খাতে খরচ বা বালাইনাশক ব্যবহারকারী কৃষকের শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, এর প্রভাবে জমি হারাচ্ছে তার উর্বরাশক্তি, বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির মাছ, হারিয়ে যাচ্ছে কৃষির জন্য উপকারী অনেক কীটপতঙ্গ, পাখি। শুধু বালাইনাশক নয়, রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারও একইভাবে ক্ষতি করছে গোটা প্রতিবেশের।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি হওয়ার একটি বড় কারণ বালাইনাশকের সহজলভ্যতা।
বাড়ছে অম্লত্ব, কমছে উর্বরাশক্তি: বাংলাদেশ মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন মো. শোয়েব প্রথম আলোকে বলেন, মাটি একটি জীবন্ত জটিল বস্তু। মাটির উপরিভাগের চার থেকে ছয় ইঞ্চি পুরু স্তরটি এক মহামূল্যবান সম্পদ। কেবল এই স্তরটিই গাছের খাদ্য উপাদানের জোগান দিয়ে থাকে। এক চা-চামচ পরিমাণ আদর্শ মাটিতে ৪০০ কোটির বেশি অণুুজীব থাকে। কিন্তু কোনো কারণে যদি মাটিতে থাকা অণুজীবগুলো মারা যায় বা অনুকুল পরিবেশে থাকতে না পারে, তাহলে মাটি থেকে গাছের খাদ্য গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ব্যাহত হয় ফসলের উৎপাদন। কেননা এই অণুজীবগুলোই মাটিতে থাকা খাদ্য উপাদানগুলোকে গাছের গ্রহণোপযোগী করে।
বালাইনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে কৃষিজমির কতটা ক্ষতি হচ্ছে? জবাবে মো. শোয়েব বলেন, কৃষি-রাসায়নিক বা অ্যাগ্রো-কেমিক্যাল (রাসায়নিক বালাইনাশক, রাসায়নিক সার ইত্যাদি) ব্যবহারের ফলে মাটির ভেতরের অণুজীবগুলো তাদের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি কমে যায়। ভেঙে যায় মাটির বুনট। শক্ত হয়ে পড়ে মাটি। মাটির পরিমিত পানি ও বাতাস ধারণক্ষমতা কমে যায়। বেড়ে যায় অম্লত্ব। আর অম্লত্ব বেড়ে গেলে মাটি থেকে গাছের খাদ্য-উপাদান গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়।
মো. শোয়েব বলেন, ১০ বছর ধরে দেশের ৪০টি নির্ধারিত এলাকা থেকে ‘মাটির উর্বরতা পরিবীক্ষণ কর্মসুচির’ অধীনে মাটির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের মাটি অম্লধর্মী হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অসম হারে যত বেশি কৃষি-রাসায়নিক ব্যবহার করা হবে, মাটির স্বাস্েথ্যর ততই অবনতি হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে মাটি একসময় পুরোপুরি অনুর্বর হয়ে যেতে পারে। মো. শোয়েব বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই ফসল উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু তা কোনোভাবেই প্রতিবেশের ক্ষতি করে নয়।’
দুষিত হচ্ছে মাছের আবাসস্থল, উৎপাদন কমছে মাছের: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জাহের প্রথম আলোকে বলেন, রাসায়নিক কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে মিঠাপানির অনেক ছোট মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে মাছেরা ডিম পাড়ে। দেশীয় প্রজাতির মাগুর, শিং, কই, টাকি, পুঁটি, টেংরা, পাবদা, মেনি প্রভৃতি প্রজাতির ছোট মাছ অগভীর জলাশয়, বিল, হাওরে ডিম পাড়ে। আর অগভীর এসব জলাশয়ে আগাম আমন, নাবি বোরো জাতের ধান চাষ ওই সময়টাতে হয়ে থাকে।
মো. জাহের বলেন, ‘ক্ষেতে পোকা দেখলেই বেশির ভাগ কৃষক কীটনাশক ছিটাতে শুরু করে। ছিটানো কীটনাশক যখন ধানগাছের নিচে থাকা পানিতে মেশে, তখন তা মাছের ফুলকা, যকৃৎ, বৃਆের (কিডনি) ক্ষতি করে। মাছের স্মায়ুতন্ত্র, প্রজননতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছ স্বাভাবিক মাত্রায় ডিম দিতে পারে না। ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের হার কমে যায়। পোনা বাঁচার হার কমে যায়।’
মারা যাচ্ছে উপকারী পোকা: ফসলের জন্য অনিষ্টকারী পোকা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে উপকারী পোকা। উপকারী পোকারা অনিষ্টকারী পোকাদের দমনে অত্যন্ত কার্যকর ভুমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সমন্বিত বালাই-ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রধান পর্যবেক্ষক ড. সৈয়দ নুরুল আলম বলেন, ‘গবেষণা ও জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, আমাদের দেশে ধানক্ষেতে ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা থাকে চার গুণ বেশি। অর্থাৎ শতকরা ১৭ থেকে ২০ ভাগ ক্ষতিকর পোকার বিপরীতে ৮০ থেকে ৮৩ ভাগ উপকারী পোকা বিচরণ করে। একইভাবে সবজিতে শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষতিকর পোকার বিপরীতে সাধারণত ৭০ ভাগ উপকারী পোকা মাঠে ঘোরাফেরা করে।’
কিন্তু রাসায়নিক কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকারী পোকারা। এ তথ্য কীটতত্ত্ববিদ ও কৃষি বিভাগের মাঠ-কর্মকর্তাদের।
এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শরীফ মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জমিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করলে সবার আগে উপকারী পোকারা মারা পড়ে। কারণ উপকারী পোকারা সাধারণত ওপরের দিকে বিচরণ করে। তাদের ভয়ে ক্ষতিকর পোকারা গাছের নিচের দিকে আশ্রয় নেয়। আমাদের দেশে শতকরা ৯০ ভাগ বালাইনাশক ওপর থেকে ছিটানো হয়। ফলে প্রথমেই ওপরে থাকা উপকারী পোকারা মারা যায়।’ তিনি বলেন, যখন ক্ষেতে কীটনাশক ছিটানো হয়, তখন নিচের দিকে থাকা ক্ষতিকর পোকারা ফসলের ক্ষেত থেকে সরে গিয়ে পাশের আলে ঘাসের ভেতর আশ্রয় নেয়। কীটনাশকের প্রভাব কমে গেলে এবং তাদের শত্রু ‘উপকারী পোকারা’ মারা গেলে অনিষ্টকারী পোকারা আরও বেশি মাত্রায় ফসলের ক্ষতি করে। তখন ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কীটনাশকের সহজলভ্যতা আত্মহত্যা সংগঠনের বড় কারণ: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি হওয়ার একটি বড় কারণ বালাইনাশকের সহজলভ্যতা। গ্রামাঞ্চলে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, তার ৯০ শতাংশের বেশি ঘটছে বিষপানজনিত কারণে। আর এসব ঘটছে দরিদ্র অথবা সচ্ছল কৃষক-পরিবারে।
বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ঝিনাইদহে। ঝিনাইদহ জেলা সিভিল সার্জন অফিসের সুত্রমতে, এই জেলায় গত পাঁচ বছরে (২০০৩ থেকে ২০০৭) মোট ৭৮৩ জন আত্মহত্যা করে। এদের ৭৫১ জনের মৃত্যু হয় কীটনাশক পানে। অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে কীটনাশক পানে।
সিভিল সার্জন নিরঞ্জন সরকার বলেন, ‘কীটনাশকের সহজলভ্যতা আত্মহত্যা সংগঠনের একটি বড় কারণ। কৃষকের ঘরে কীটনাশক এখন অত্যন্ত মামুলি বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ঝিনাইদহে আত্মহত্যা নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা সোসাইটি ফর ভলানটারি অ্যাকটিভিটি (শোভা)। শোভার নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজকাল আলু-পেঁয়াজের মতো মুদিদোকানে হরহামেশা কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। যেন কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’

Wednesday, June 18, 2008

বিশ্ব মরুকরণ ও খরা দিবস

গত পরশু বিশ্ব মরুকরণ ও খরা দিবস পালিত হল। খবরটি তেমন প্রচারণা পায় নাই। অথচ ব্যাপক প্রচারিত হওয়া উচিত ছিল। আবহাওয়ামণ্ডলে কার্বনের উপস্থিতি, বিশ্বের উষ্ণতাবৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হয়ে গেছে, তাতে আমাদের আবহাওয়ার সামান্যতম হেরফেরকে কোনরকম উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গরমের পরিমাণ শীতপ্রধান দেশগুলোর চাইতে অনেক বেশি। এ কথা সত্য। কিন্তু নদীমাতৃক দেশ হওয়ার কারণে দেশের সামগ্রিক তাপমাত্র সহনশীলতার মাত্রাকে কখনও ছাড়িয়ে যায় না। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে এই স্বস্থি আর ধারাবাহিক থাকছে না। ব্যাপকহারে বৃক্ষ কর্তন, বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া, নদীগুলোতে জলের অভাব, নতুন গাছ না লাগানো ইত্যাদি কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গার মরুকরণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। বিশেষত উত্তরবঙ্গে গত কয়েক বৎসর হল যে পরিমাণ গরম পড়ছে তা পূর্ববর্তী শত বৎসরের প্রেক্ষিতে খুবই বিরল একটি ঘটনা। অথচ এখন এই গরমের প্রাবল্য কোন বিরল ঘটনা নয়। একটি নিয়মিত সাংবাৎসরিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই বৎসর তেমন গরম অবশ্য পড়েনি। কিন্তু যে বৎসরে একটু বেশি গরম পড়বে সেই বৎসরগুলোতে জনজীবন যে কিরকম বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। লু হাওয়া শব্দটিই বিদেশী। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় লু হাওয়ার প্রাদুর্ভাব কখনই ছিল না। কিন্তু গত ৮-১০ বৎসরে শব্দটি বাংলা ভাষায় ধীরে ধীরে অনুপ্রবিষ্ট হচ্ছে। এর পিছনে আবহাওয়ার পরিবর্তনই মূখ্য ভূমিকা পালন করছে। আফ্রিকার দেশগুলোতে ফি বৎসর খরা হয়। সেখানের মানুষের জীবনে এটা এক অন্যতম দুর্যোগ। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা যদি খরা সম্পর্কে এখনই সচেতন না হয় তাহলে তাদের কপালেও যে আফ্রিকার মানুষদের মতো দুর্ভোগ আছে এ কথা বলার জন্য ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হবার প্রয়োজন নেই।

Thursday, June 5, 2008

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। দিনে দিনে পরিবেশের যে পরিবর্তন হচ্ছে তা অনেকাংশেই জনপদের জন্য সমস্যা ডেকে আনছে এবং আগামীতেও আরও বেশি করে জনপদের ক্ষতি করবে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে গেছে। ফলে অসময়ে ঝড়, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস তো আছেই। এছাড়া মেরু অঞ্চলে বরফ গলার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তুষারাবৃত অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয় তথা বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাবে। পাশাপাশি সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাংলাদেশের মত সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোর এক তৃতীয়াংশ জলের নিচে তলিয়ে যাবে। শুধু তাই নয় বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আবহাওয়া ও জলবায়ুর যে পরিবর্তন হয়েছে তাতে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি উৎপাদন আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ৩০ ভাগ কমে যাবে। ফলে যে খাদ্যের সংকট হবে তাতে আর একটি দুর্ভিক্ষ হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। অর্থাৎ পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো প্রধানত ক্ষতি করবে মানুষের।
১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গঠিত হয় UNEP (United Nations Environment Programme)। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিকরণই এর মূল উদ্দেশ্য। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক বৎসরের ৫ জুন তারিখে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। বিভিন্ন আলোচনা, সভা, সেমিনার ও প্রচারণার মাধ্যমে গণমানুষকে পরিবেশ দূষণ, তার কারণ, প্রভাব ও আমাদের তথা মানুষের করণীয় বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা চালানো হয়।
পরিবেশ দূষণের বেশিরভাগ কারণ মানুষ সৃষ্ট। জীবাশ্ম জ্বালানী, বর্জ্য পদার্থে অব্যবস্থাপনা, শক্তির অপচয় ইত্যাদি কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। শক্তির উৎস হিসেবে জ্বালানীচালিত জেনারেটর ব্যবহার না করে যদি সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তিকে ব্যবহার করা হয়, সাধারণ ফিলামেন্ট বাল্ব না ব্যবহার করে যদি এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করা হয়, ব্যক্তিগত পরিবহন বাদ দিয়ে যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা সাইকেল/ রিক্সা তথা অযান্ত্রিক পরিবহন ব্যবহার করা হয় তাহলেও পরিবেশ দূষণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইড পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংসের অন্যতম কারণ। বায়ুমণ্ডলে এই কার্বন জমে গিয়ে পুরু স্তর তৈরি হয়ে গিয়েছে। ফলে দিনের বেলায় সূর্যালোক থেকে সৃষ্ট তাপ রাত্রে আর বিকিরিত হতে পারে না। এতে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। এর ফলে মেরুঅঞ্চলের বরফ গলে দিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মত সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলো। এইসব দেশের সমূদ্র উপকূলের নিম্নভূমিগুলো অতিরিক্ত জলে প্লাবিত হয়ে যাবে। ফলে মানুষের বাসস্থান ও খাদ্য উৎপাদনের জমিগুলো সমুদ্রের লবণাক্ত জলের নিচে তলিয়ে যাবে।

এবারের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হল "Kick the Habit! Towards a Low Carbon Economy " এর বাংলা করা হয়েছে - "আর নয় কার্বনের বিষ: চাই পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি"। সত্যিই তাই। আমাদের বিভিন্ন অভ্যাসগুলোকে যদি একটু পাল্টাতে পারি, যদি পরিবেশবান্ধব অভ্যাসকে আত্মস্থ করতে পারি তাহলেই সম্ভব আমাদের এই ধরিত্রী মাতাকে সুস্থ করে তোলা। না হলে ক্ষতি তো হবে আমাদের এই মানুষেরই।

Thursday, May 29, 2008

জাতীয় বৃক্ষ

আজকের বিডিনিউজ ২৪ এ দেখলাম নজরুল সেনাদল ও নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে কৃষ্ণচুড়ার নাম প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবের স্বপক্ষে ঠিক কি কি যুক্তি তারা বলেছে তা খবরে বিস্তারিত নেই। তারা বারবার কৃষ্ণচূড়াকে পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ বলেছে। আমি তাদের বক্তব্য ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমার জানামতে কৃষ্ণচূড়া একটি বিদেশী গাছ। কতদিন আগে এদেশে এসেছে তা বলতে পারব না। তবে এই গাছ এসেছে মাদাগাস্কার থেকে। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে এর সৌন্দর্যের জন্য। মৌসুমে যখন গাছভর্তি লাল ফুল ফোটে তখন তার সৌন্দর্য সত্যিই অনুপম হয়ে ওঠে। চারপাশের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে গাছটি পরিবেশ বান্ধব। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই গাছে পাখিরা কম বসে। পাখিরা বাসা বানায় না। এর ফল পাখিদের খাদ্য নয়। তাহলে কিভাবে এই গাছকে পরিবেশ বান্ধব বলা যায় তা ঠিক বোধগম্য হল না। বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে যদি কোন গাছকে নির্বাচন করতে হয় তাহলে আমি মনে করি বটগাছকে এই সম্মানটা দেয়া উচিত। বটগাছ আমাদের প্রকৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতিতে যত জায়গা জুড়ে আছে তার বিপরীতে আমাদের প্রতিদান একটুও নেই। বরং আমরা পরিবারের অভিভাবকের মত বটবৃক্ষকে ইটের ভাটায় অবলীলায় বিসর্জন দিয়েছি। আমাদের লোভ বয়সী অভিভাবকের হত্যালীলায় বাধা দেয় নি। অথচ বটগাছ পথিককে ছায়া দিয়ে, পাখিকে আশ্রয় দিয়ে, বিভিন্ন প্রাণীকে কোলে বাসা বানাতে দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। দেশী সব পাখিরা বটের ফল খেতে দারুণ পছন্দ করে। সকলে এর ডালে, পাতার ফাঁকে বাসা বানায়। বটবৃক্ষের শরীরের খোড়লে পেঁচা, সাপ প্রভৃতির বাসা অবলীলায় স্থান পায়। এখন হয়ত বটগাছকে ততটা দেখা যায় না। তার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন বিদেশী গাছ। যদি বিদেশী কোন গাছকে জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে তাহলে ইউক্যালিপটাসকেই বরং তা দেয়া উচিত। এই পরিবেশ বিধ্বংসী গাছটিকে আমরা যতটা ভালবাসি, দেশের আনাচে কানাচে তথা জমির আল, আলাদা জমি, বাড়ির কোণ/ উঠান, পুকুরের পাড় ইত্যাদি জায়গায় যেভাবে স্থান দিয়েছি তাতে তাকে জাতীয় বৃক্ষ না বলেই বা উপায় কি? আমি নজরুল সেনা বা নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদকে অসম্মান করতে চাচ্ছি না। তাদের যুক্তি হয়ত আরও শাণিত হতে পারে, যা খবরে বিস্তারিত আসে নি। তবে জাতীয় বৃক্ষ বলতে কোন গাছকে ঘোষণা করার আগে তা অবশ্যই উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষ করে দ্বিজেন শর্মার মতামত নিয়েই করা উচিত। আজ প্রকৃতিপ্রেমিক দ্বিজেন শর্মার ৮০তম জন্মদিন গেল। এই সুযোগে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও ভালবাসা জানাচ্ছি।

Saturday, May 17, 2008

পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে

গত ১০ ও ১১ মে তারিখে বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস পালিত হল। এরই প্রেক্ষিতে (সম্ভবত) ১৩ মে বাংলাদেশ নেচার কনজারভেশন কমিটি একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। এই সভায় বেশ কিছু আশংকাজনক তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে। তারা বলেছেন ৩০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ১০০ প্রজাতির মত পাখি এখন আর বাংলাদেশে আসছে না। তারা অন্য কোন দেশে চলে যাচ্ছে। এতে অবশ্য পাখিদের কোন দোষ নেই। তারা যেখানে নিরাপত্তা পাবে সেখানেই যাবে। এন সি সি আরও বলেছে দেশীয় প্রজাতির প্রায় ১০ প্রজাতির পাখি গত ২০ বছরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কি মর্মান্তিক ঘটনা!

এনসিসি'র মতে পরিযায়ী পাখির মধ্যে ডানলিন, রাডি টার্নস্টোন, টেরেক সেন্ডপাইপার, গ্রেটেল্ড কাটলার, মার্সসেন্ড পাইপার, স্পোনবিল সেন্ডপাইপার, গ্রেটার ইয়োলো লেগ, স্পটেড রেডসেঙ্ক প্রভৃতি পরিযায়ী পাখি এখন আর বাংলাদেশে আসে না।

বাংলাদেশের নিজস্ব প্রজাতির পাখির মধ্যে বেঙ্গল ফ্লোরিক্যান, ভারতীয় ময়ূর, গ্রেটহর্ন বিল, গ্রেটহর্ন আউল, আলেকজান্দ্রা প্যারাকিট, কোরাল, ওয়াটার কক, বাদি হাঁস বিলুপ্ত প্রজাতির খাতায় নাম লিখিয়েছে। অনেক আগে গোলাপী হাঁস নামে এক প্রজাতির হাঁস জাতীয় পাখি বাংলাদেশে ছিল। সেটাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এনসিসি-এর প্রধান সাজাহান সরদার এর মতে ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পাখিশুমারী শুরু হয়। আর বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পাখি গণনা শুরু হয় ২০০২ সালে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে গত বিশ বৎসরে এদেশের নিজস্ব প্রজাতির ৫০ রকমের পাখি বিলুপ্তির পর্যায়ে গেছে। আর পরিযায়ী পাখির বৈচিত্র্য কমে গেছে। আগে আসত ৩০০ প্রজাতির, আর এখন আসে ২০০ প্রজাতির। ১০০ প্রজাতির পাখি অন্য দেশকে নিজেদের পরিযায়ন এলাকা হিসেবে পছন্দ করেছে। বিডিনিউজ২৪ এ প্রকাশিত কিছু তথ্য সরাসরি তুলে দিচ্ছি।

পাখি বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খানের মতে, ইউরেশিয়ায় ৩শ' প্রজাতির বেশি প্রজননকারী পাখির এক তৃতীয়াংশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া বা আফ্রিকায় পরিযান করে। এসব পাখির এক তৃতীয়াংশ আসে বাংলাদেশে। এখানে সাইবেরিয়া থেকে কম সংখ্যক পাখি আসে, বেশিরভাগই আসে হিমালয় ও উত্তর এশিয়া থেকে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ট্রাস্টের (WTB) পরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "পরিযায়ী-স্থানীয় পাখি একটি এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও খাদ্য পরিস্থিতির নিদের্শক হিসাবে কাজ করে। এদের আনাগোনা কমে যাওয়া মানে তাদের আবাস ও খাদ্য ঘাটতির লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠা। এসব পাখি যাত্রা পথে খাবার ও বিরতির জন্যে দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট পথে চলাচল করে। খাবারের সঙ্কট হলে অন্যত্র গমন করে।"

স্থানীয় ১০ প্রজাতির পাখি পুরোপুরি বিলুপ্তির আশঙ্কা প্রকাশ করে সাজাহান সরদার জানান, গত ২০ বছরে শ'খানেক প্রজাতির বেশি পাখি রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। দেশের জন্য এটি একটি চরম বিপদ সংকেত।

আসলে আমাদের দরিদ্রতাই আমাদের চরম শত্রু। পেটে খিদে থাকলে কোন সচেতনতাই আর কাজ করে না। মানুষ যেখানে কষ্ট পায় সেখানে পাখিদের কষ্ট না হয়ে উপায় কি আর আছে?

Saturday, May 10, 2008

বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস

আজ এবং আগামীকাল বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস (World Migratory Bird Day) পালিত হচ্ছে। পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলকে নিরাপদ রাখা ও পাখিদের বিচরণস্থল সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে এই দিবসে। পরিযায়ী পাখিদের সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়াতে ২০০৬ সাল থেকে এই দিবস পালন শুরু করা হয়। প্রত্যেক বৎসর ১০ ও ১১ মে তারিখে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে এই দিবসকে পালন করা হয়। এবারের দিবসের শ্লোগান হল "পরিযায়ী পাখি: জীব বৈচিত্রের দূত"। বর্তমান বিশ্বের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একারণে পরিযায়ী পাখিরা মারাত্মক খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়েছে। এই অবস্থা দূরীকরণই এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য।

পরিযায়ী পাখিদেরকে আগে অতিথি পাখি বলা হত। কিন্তু নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে যে এরা অতিথি নয়। বরং যে দেশে যায় সেখানে তারা ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বের হওয়া পর্যন্ত বাস করে। অর্থাৎ বৎসরের বেশ কয়েকমাস তারা ভিনদেশে বাস করে। বরং তারা নিজ দেশে বাস করে স্বল্প সময়ের জন্য। এই সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি হওয়া দরকার। বাংলাদেশে এখনও মানুষের মধ্যে সেভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয় নাই বলে এখনও পরিযায়ী পাখিদেরকে সুস্বাদু খাদ্যের উৎস বলে মনে করা হয়। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া আবশ্যক।

Monday, April 21, 2008

রাস্তার পাশে গাছ




রাস্তার পাশে এরকম গাছ থাকলে সত্যিই ভাল লাগে। মানুষের যাওয়া আসার ক্লান্তির অনেকটা উপশম হয়ে যায়। গ্রীষ্মের তাপদাহে যখন পথিক অবসন্ন হয়ে পড়ে, তখন গাছতলার ছায়া যে কি স্বস্তি দেয় তা ঘটনার শিকার ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে পারেন। আর শুধু ছায়া কেন, ফলবান বৃক্ষ হলে কিংবা দেশী বৃক্ষ হলে পাখিরা সেখানে বাসা বাঁধতে পারে। প্রকৃতির সদস্য হয়ে জীবনের বিস্তৃতি এবং বিকাশ ঘটাতে পারে। উপরের ছবি নেয়া হয়েছে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার শ্রীখাতা গ্রাম থেকে।

Wednesday, April 9, 2008

লামচিতা

বাংলাদেশে একটি অসাধারণ বাঘ আছে। এর নাম লামচিতা। এমন বাঘ আগে উপমহাদেশের মাটিতে নিশ্চিন্তে সদলবলে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু কালপরিক্রমায় তারা মানুষের সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপের কাছে হেরে গেছে। এখন ভারতে এই বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের একমাত্র লামচিতা বাঘটি রয়েছে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের খাচায়। এর ইংরেজি নাম Clouded Lepard । এই বাঘটা মেয়ে বাঘ। একটি পুরুষ বাঘ পাওয়া গেলে বংশবিস্তার করা যেত। কিন্তু অনেক খুজেও এর কোন জোড়া পাওয়া যায়নি। বাঘটির বয়স মাত্র ৪ বছর। ময়মনসিংহের গারো সম্প্রদায়ের মানুষেরা মাত্র ৬ মাস বয়সের এই বাঘটিকে তাদের বসতি এলাকা থেকে ধরেছিল। একা একাই ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাঘটি। তারা মনে করেছিল এটা বোধহয় কোন বিরল প্রজাতির বিড়াল ছানা। কিন্তু আসলে এটা ছিল একটা সত্যিকারের বাঘ। সেই থেকে ৪ বছর হয়ে গেছে। এখন এর ওজন ২০ কেজি। লম্বা সাড়ে ৪ ফুট। উচ্চতা দেড় থেকে দুই ফুট। আফ্রিকা ও কেনিয়াতে এই প্রজাতির বাঘ পাওয়া যায়। বর্তমানে এই প্রাণীটি বিশ্বে দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর তালিকায় নাম লিখিয়েছে। বাংলাদেশে এই বাঘ পাওয়ার অর্থ আমাদের এই দেশ পূর্বে এই বাঘের নিরাপদ আবাসভূমি ছিল।

পাখির কথা ও শরীফ খান

গত শুক্রবারের প্রথম আলোর অন্য আলো পড়ছিলাম। পাখি বিশারদ শরীফ খান সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। তার জীবন ভাবনা, পাখি বিষয়ক আগ্রহ, কর্ম পরিধি সবকিছু সম্পর্কে সংক্ষেপে ভাল তথ্য পেলাম। তিনি আগে পাখি মারতেন। বাড়িতে বাবা-মা দুজনই পাখি শিকারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শরীফ খান নিজেও অসংখ্য পাখি শিকার করতেন। তার সবগুলোই যে প্রয়োজনে করতেন তা নয়। বেশিরভাগ সময় আনন্দের জন্য শিকার করতেন। কিন্তু একদিনের ঘটনা তার মনে এমন প্রভাব ফেলল যে তিনি সেদিন থেকে পাখি শিকার নয় পাখি রক্ষায় মনোযোগী হয়ে উঠলেন। একদিন তিনি একটি ঘুঘু পাখিকে গুলি করলেন। যথারীতি পাখিটাকে গুলি লাগল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে মাটিতে পড়ে না গিয়ে সেটা গাছের কোন একটি জায়গায় গিয়ে আটকে গেল। শরীফ খান পাখিটাকে পাড়তে গিয়ে দেখেন যে সেটা মা পাখি। বাসায় তার তিনটি বাচ্চা। তখনও চোখ ফোটেনি। মা পাখিটা সেখানে মরে পড়ে আছে। ছোট্ট ছানাদের শরীর রক্তে মাখামাখি। তার নিজের ভাষায়- "সাবধানে পাতার ঝোপ ফাঁক করে দেখি ছোট্ট তিনটি বাচ্চা, এখনো চোখ ফোটেনি। চোখে দেখে না, খাবারের জন্য হাঁ করতেছে তারা। মায়ের রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে শরীর, বীভৎস দৃশ্য। মৃত পাখিটাকে ওদের কাছে রেখে এলাম। ওই শেষ, শিকারজীবনের ইতি। ওই দৃশ্য আমি আজও ভুলিনি। এরপর থেকে অন্যদেরও শিকার করতে বারণ করা শুরু করি। একটা সময় পাখি ও বন্যপ্রাণীর চরম সর্বনাশ করেছি। তাই এখনো পাখিদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ক্ষমা চাই বন্যপ্রাণীদের কাছে, প্রকৃতির কাছে।" সত্যিই শরীফ খানের অভিজ্ঞতা মর্মস্পর্শী। একসময় আমিও পাখি শিকারে যেতাম। সে অন্যরকমের এক নেশা। তবে বড় হবার সাথে সাথে বিভিন্ন পাখি বিষয়ক বই পড়ে আমি সচেতন হয়েছি। এখন আর পাখি শিকার করিনা। পাখি শিকার করতে অন্যদের অনুৎসাহিত করি। আসলেই আমরা পাখিদের কাছে যে অপরাধ করেছি তা ক্ষমাহীন। ইউরোপ আমেরিকায় বন্যপ্রাণীদের সাথে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের। আর আমরা এখনও তাদেরকে শত্রু কিংবা দাস ছাড়া অন্য কিছু মনে করিনা। তবে যত দিন যাচ্ছে, মানুষ ততই সচেতন হচ্ছে। সরকার বা বিভিন্ন সচেতন গোষ্ঠীদের কর্মতৎপরতা বাড়ছে। শরীফ খানের একটা কথা খুব প্রণিধানযোগ্য। "প্রত্যেক থানায় সরকারি যে খাসজমি আছে তা থেকে পাঁচ বিঘা করে যদি ফেলে রাখা হয়, তাহলে আপনাআপনি যে জীববৈচিত্র্য হবে, তা হাজার বছরেও হবে না।" বিষয়টি ভাববার ও করবার মত। শরীফ খানকে আইডিয়াটির জন্য ধন্যবাদ। প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশে পাখি বিপন্ন হবার কারণ একাধিক। এ সম্পর্কে শরীফ খান বলেন -"একটা পাখি টিকে থাকতেহলে চারটা জিনিস দরকার: নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বাসা বাঁধার জন্য গাছ ও বিচরণভূমি। দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া পৃথিবীর কোনো পাখিই তাকার জন্য বাসা বাঁধে না। তারা ডিম, বাচ্চ দেওয়া অর্থাৎ বংশবৃদ্ধির জন্যই বাসা করে। আমাদের দেশে জলাভুমি কমে যাচ্ছে, তাই বিপন্ন হচ্ছে বালিহাঁস। মরা তালগাছ, সুপারি গাছে বাসা বাধে টিয়া, শালিক, বসন্তবৌরি। এখন মরা গাছ সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলা হয়। জলময়ুর বাসা বাধতে পারছে না। জলপিপির নেই চারণভূমি। খাদ্য সংকটে আছে ধূসর মাথা হট্টিটি। ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে পাখি।....'৭৪ থেকে যেকোনো ধরণের পাখি, বন্যপ্রাণী দরা, মারা পোষা আইনত নিষিদ্ধ। যেদেশে পাখি শিকার নিষিদ্ধ, সেই দেশে এয়ারগান ও পয়েন্ট টুটু বোর রাইফেল বিক্রি হয় কীভাবে?" ঠিক প্রশ্ন করেছেন শরীফ খান।

পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় শরীফ খানের তৎপরতা অনেক। পাখি নিয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য লেখা তো লিখে চলেছেন এছাড়া দুটো ডকুমেন্টারি ভিডিও চিত্র তৈরি করেছেন। নাম 'হালতি পাখির বাসা' ও 'হালতি নামা '০৭'। দুর্লভ পাখি হালতি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য, তাদেরকে রক্ষা করার জন্য তিনি ভিডিওচিত্র দুটি তৈরি করেছেন। এছাড়া গড়ে তুলেছেন 'বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাব, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সমিতি। তাদের উদ্যোগে করা হয়েছে শিশুদের সংগঠন লাভ বার্ড ক্লাব ও লাভ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাব।

শরীফ খানের উল্লেখযোগ্য বই হল বাংলাদেশের পাখি। এই বইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির পাখি আছে। এর মধ্যে পরিযায়ী পাখি রয়েছে ২০০ প্রজাতির। বিভিন্ন পাখির বর্ণনা ছাড়াও তাদের আচার আচরণের তথ্যমূলক বিবরণ রয়েছে বইটিতে।

সম্পূর্ণ ফিচারটি পড়ে ভাল লেগেছে।

Saturday, March 22, 2008

বিশ্ব জল দিবস

পাশের ছবিটি নেয়া হয়েছে worldwaterday.org থেকে
আজ ২২ মার্চ বিশ্ব জল দিবস। জল একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তু। জীবনের সচলতার জন্য জলের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। নিরাপদ জল ছাড়া সুস্থ্য থাকাও দুরূহ।
বিশ্বে প্রত্যেক ৬ জনের মধ্যে মাত্র একজন নিরাপদ জল পান করতে পারে। নারী ও শিশুরা ২০০ মিলিয়ন ঘন্টা প্রতিদিন জলের খোঁজে ব্যায় করে। তাও তার উৎস অধিকাংশ সময় থাকে দূষিত।
দুষিত জলের প্রভাব খুবই সাংঘাতিক। প্রত্যেক ১৫ সেকেন্ডে একজন শিশু জলবাহিত রোগে মারা যায়। বিশ্বে বেশিরভাগ মৃত্যু ও রোগের কারণ দূষিত জল। মার্চের ২২ তারিখ সুপেয় জলের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হবার দিন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একটি ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৯২ সালের ২২ ডিসেম্বর একটি সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে প্রত্যেক বছর ২২ মার্চ বিশ্ব জল দিবস হিসেবে পালিত হয়।
বাংলাদেশের বিশুদ্ধ জলের অভাব খুব প্রকট। শহরাঞ্চলে তো বটেই গ্রামাঞ্চলও এর প্রভাবে বাইরে না। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া আর্সেনিক এর সংক্রমণ দুষিত জলের মাধ্যমেই ঘটেছে। আমাদের এখনই সুপেয় জল বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।

Friday, March 7, 2008

প্রথম জাতীয় হাওড় সম্মেলন

আজ জনকণ্ঠে প্রকাশিত একটা খবর পড়লাম। হাওড়কে বাঁচাবার জন্য জাতীয় সম্মেলন হচ্ছে। এটা 'প্রথম জাতীয় হাওড় সম্মেলন'। হাওড়ের প্রকৃতি, পরিবেশ ও হাওড়বাসীর জীবনজীবিকা রক্ষায় জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে দু'দিনব্যাপী এই সম্মেলন শুরু হয়। উদ্বোধন করেন সাবেক বিচারপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান। খবরটি স্বস্তির। কারণ বিষয়টির সঙ্গে ২ কোটি লোকের জীবিকা জড়িত। হাওড়ের সঙ্গে আমাদের সমাজ, লোকজ জীবন, সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমিক ও বিশেষজ্ঞ বিচারপতি হাবিবুর রহমান কথাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, হাওড় অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হচ্ছে সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রচলিত নীতিমালা। এ অঞ্চলের মৎস্যসম্পদের ওপর দরিদ্র মৎস্যজীবীদের কোন অধিকার নেই। হাওড় অঞ্চলের ইজারা প্রথা দরিদ্র মৎস্যজীবীদের অধিকার তেকে বঞ্চিত করেছে। তারা একদিকে পুরনো আইনের কাছে যেমন বন্দী অন্যদিকে সমাজের প্রভাবশালীদের হাতেও জিম্মি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, জীববৈচিত্রসহ হাওড়ে রয়েছে বিশাল সম্পদের ভাণ্ডার। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন হলে হাওড় থেকে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মৎস্য আহরণ সম্ভব। তিনি আরও বলেন, এই সম্মেলন হাওড়ের জীবনজীবিকা, প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা ও হাওড়ের সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আইনের অসঙ্গতি চিহ্নিত করে তা নিরসনের জন্য পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করতে পারে।

আব্দুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, হাওড়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে জাতীয় সম্পদের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

সম্মেলনের প্রতম দিনে মোট চারটি অধিবেশন হয়। হাওড়ের নীতি পর্যালোচনা, হাওড়ের বন্যা ব্যবস্থাপনা, হাওড়ের জীবনজীবিকা, হাওড়ের কৃষি, হাওড়ের শিক্ষার গুণগতমান ও হাওড়ের নারীর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এই খবরটি আমার কাছে বেশ আশাপ্রদ মনে হল। হাওড়কে নিয়ে যে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে এটা খুবই আনন্দের। বাংলাদেশের হাওড় অঞ্চল বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। অর্থনৈতিক উর্বরতা ছাড়াও পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম বিশ্রামস্থল হল এই হাওড়গুলো। সিলেটের হাকালুকি হাওড় এর মধ্যে অন্যতম।

Thursday, February 21, 2008

বার্ড ফ্লু (Bird Flu) ২

এই লেখাটি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেছি। কিন্তু ঠিক কোন সাইট থেকে তা এই মুহূর্তে মনে পড়ছেনা। (রোগটির ভয়াবহতা ও এর প্রতি আমাদের সচেতনতা ও করণীয় বিবেচনা করে মূল লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতাসহ এখানে লেখাটি পুন:প্রকাশ করলাম।

বার্ড ফ্লু ভাইরাস কী?
বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন বা পাখি সম্পর্কিত রোগ একই। আর্থোমিক্সিরিডি গোত্রের ভাইরাস আক্রান্ত পাখিদের রোগ। মুরগি বা যেকোনো পাখি এই ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হয়। এই ভাইরাসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ১৮৭৮ সালে। ১৯৫৫ সালে ইতালিতে এই ভাইরাসে আক্রান্তকে ফাইল প্লেগ নামে পরিচিত করা হয়। বর্তমান নাম বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। এই ভাইরাসের অনেক সাব-টাইপ বা স্ট্রেন রয়েছে। এসব স্ট্রেনের মধ্যে এইচ-৫, এন-১ সবচেয়ে মারাত্মক। দ্রুত এক পাখি থেকে ঝাঁকের অন্য পাখিদের আক্রমণ করে। পাখির লালা ও মলের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার করে। আক্রান্ত পাখি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়।

কীভাবে ছড়ায়?
বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস পাখির অন্ত্রে বাস করে। বিষ্ঠা বা মলের সঙ্গে বের হয়ে আসে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস বা আক্রান্ত পাখির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে শ্লেষ্ক্না ও কফ আকারে বের হয়ে এসে সুস্থ পাখিদের আক্রমণ করে। অতিথি পাখিরা সাধারণত এই ভাইরাসের অন্যতম বাহক। আক্রান্ত পাখির বিচরণে, খামার যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও খামারের কর্মীদের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

চেনার উপায়:
ভাইরাস আক্রমণের তিন থেকে ১০ দিন পর রোগের লক্ষণ পাওয়া যায়। আক্রান্ত পাখির পালক উসকোখুসকো হয়ে যায়। ক্ষুধামন্দা ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মাথার ঝুঁটির গোড়ায় রক্তক্ষরণ হয়। পায়ের পাতা ও হাফ-জয়েন্টের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে রক্ত জমে যায় ও রক্তক্ষরণ হয়। হঠাৎ করে মুরগির ডিম উৎপাদন হার কমে যায়ে। শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। মৃত্যুহার বেড়ে যায়।

  • খামারে হঠাৎ করেই এ রোগ ছড়াতে পারে। একসঙ্গে অনেক মুরগি মারা যাবে। অসুস্থতার লক্ষণ ছাড়াই মারা যেতে পারে। অবসাদ, ঝিমুনি, ক্ষুধামন্দা, উসকোখুসকো পালক, জ্বর। এসব লক্ষণের পর মারা যেতে পারে।
  • দুর্বলতা ও চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। আক্রান্তরা চুপচাপ বসে থাকে। মাথা মাটিতে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
  • অল্প বয়সের মুরগিদের পক্ষাঘাত দেখা দেবে।
  • ডিম পাড়া কমে যাবে; নরম খোসাযুক্ত ডিম পাড়ে।
  • গলা ও মাথার ঝুঁটি ফুলে যায়। গাঢ় লাল বা নীল রং ধারণ করে এবং কখনো কখনো ক্ষুদ্র বিন্দুর রক্তক্ষরণ দেখা দেয়।
  • আক্রান্তরা শ্বাসকষ্টে ভোগে।
  • শরীরের পালকবিহীন অংশ যেমন পায়ে রানের নিচের অংশে রক্তক্ষরণ হবে।
  • খামারে ১০০ ভাগ পর্যন্ত মোরগ-মুরগি মারা যায়।
  • হাঁস ও রাজহাঁসদেরও একই লক্ষণ দেখা দেবে।
  • অনেক ক্ষেত্রে হাঁস রোগের লক্ষণ ছাড়াই জীবাণু ছড়াতে পারে।


শরীরের ভেতরে পরিবর্তন:

  • শরীরের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং হূৎপিন্ডের ভেতর ও বাইরে ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো রক্তক্ষরণ দেখা যায়।
  • চামড়ার নিচে বিশেষ করে ঘাড়ে ও পায়ের গিরায় প্রচুর পানি জমে।
  • মৃতদেহ পানিশুন্য হয়ে যেতে পারে।
  • প্লীহা, বৃਆ, কলিজা এবং ফুসফুস ইত্যাদিতে ধুসর রঙের মৃত কোষ থাকতে পারে।
  • বায়ুথলি অস্বচ্ছ হতে পারে এবং ধুসর বা হলুদাভ তরল পদার্থ পাওয়া যেতে পারে।
  • প্লীহা বড় হতে পারে এবং রক্তক্ষরণের ফলে গাঢ় রং ধারণ করতে পারে।

একই লক্ষণের অন্য রোগ:
এসব রোগ-লক্ষণ বার্ড ফ্লু থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এসব রোগেও খামারের মুরগি দ্রুত মারা যায়।

  • তীব্র রানিক্ষেত রোগ।
  • ডাকপ্লেগ রোগ। মুরগির ডাকপ্লেগ হয় না।
  • মুরগির সংক্রামক করাইজা।
  • তীব্র বিষক্রিয়া।

কেন মারাত্মক:
এটি মারাত্মক রোগ। খামারের মুরগি দ্রুত মারা যেতে পারে। খামার থেকে খামার ও এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রোগগ্রস্ত মুরগি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটতে পারে। দুইভাবে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। অতিসংক্রামক হাইপ্যাথজেনিক এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ঐচঅও, আবার মৃদু সংক্রামক বা লোপ্যাথজেনিক খচঅও অবস্থায়ও ছড়াতে পারে।

খামারকর্মীদের সতর্কতা:
এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে এ ভাইরাসে প্রায় ২০০ মানুষ মারা গেছে। এদের সবাই খামারকর্মী। সে কারণে ভোক্তা নয়, খামারকর্মী ও আক্রান্ত খামারের মুরগি নিধনে নিয়োজিতদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। দরকারি বেশভুষা ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, পায়ে প্লাস্টি গাম বুট ও অ্যাপ্রোন পরতে হবে। শারীরিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। যারা জীবন্ত মুরগির বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত তাদেরও এসব পেশাক পরে থাকতে হবে। খামারে জীব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শেডে প্রবেশের সময় ফুটপথে জীবাণুনাশক মিশ্রিত পানি রাখতে হবে। এতে পা ধুয়ে খামারে প্রবেশ নিশ্চিত করা দরকার। খামার ও জীবন্ত মুরগির দোকানের চারপাশে নিয়মিত ফরমালিন বা শক্তিশালী জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। কোনোভাবেই অতিথি পাখিদের সংস্পর্শে আসা যাবে না।

প্রতিষেধক ওষুধ:
চীন ও ফ্রান্সসহ অনেক দেশই মুরগির এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য লাইভ ভ্যাকসিন আবিষ্ককার করেছে। চীনের স্টেট মিডিয়া জানায়, অরবিন রিসার্স ইনস্টিটিউট বার্ড ফ্লু প্রতিরোধে চার বছর গবেষণা করে লভি ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে। এই ভ্যাকসিন বার্ড ফ্লু ভাইরাসসহ রানিক্ষেত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করবে।
খামারের মুরগিদের এই ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে। বার্ড ফ্লু রোগে আক্রান্ত হাঁস-মুরগি ও কবুতরসহ কোনো পাখিরই কোনো চিকিৎসা নেই। উন্নত বিশ্বে এ রোগের টিকা দেওয়ার প্রথা চালু থাকলেও আমাদের দেশে এখনো এ টিকা আমদানি করার অনুমতি নেই। দীর্ঘমেয়াদি রোগপ্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

রান্না মাংস-ডিমে ভয় নেই:
এই ভাইরাসে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশিষ্ট পশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মনজুর আজিজ বলেন, "আমরা যে তাপে মুরগির মাংস রান্না করি সেই তাপে কোনো জীবাণু বাঁচে না।
তা ছাড়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত মুরগি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। বাজার থেকে তাজা, সবল জীবন্ত মুরগি কিনলে তা পুরোপুরি নিরাপদ। আক্রান্ত মুরগি বাজার পর্যন্ত আনতে আনতে তাজা থাকবে না। তবে বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে অল্প সেদ্ধ মাংস বা ডিম না খাওয়াই ভালো। এ ছাড়া রান্নার আগে মাংস কাটার পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।"
খামারকর্মীদের শেডে কাজ করার সময় মাস্ক পরে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে। থুতু ফেলা যাবে না। কাজ শেষে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ও পা ভালো করে ধুয়ে ফেলা দরকার।

জীব-নিরাপত্তা জোরদারের বিকল্প নেই:
বায়ো সিকিউরিটি বা জীব-নিরাপত্তা একটি সাধারণ জ্ঞান। এক কথায় জীব নিরাপত্তা হলো খামারের মুরগি ও খামারকর্মীদের রোগজীবাণুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখা। জীব-নিরাপত্তা নিতে অতিরিক্ত কোনো খরচ হয় না। এটি মূলত আচরণবিধি। এর ফলে রোগজীবাণু থেকে খামার রক্ষা পাবে এবং হাঁস-মুরগি রোগজীবাণু থেকে মুক্ত থাকবে।
খামারের হাঁস-মুরগি সব সময় ভালো জায়গায় রাখতে হবে। ভালো জায়গা হলো পরিষ্ককার পানি ও খাবারের ব্যবস্থা আছে এমন জায়গা; যেখানে নিয়মিত টিকা ও ওষুধপথ্যের ব্যবস্থাও আছে।হাঁস-মুরগি সব সময় সংরক্ষিত ঘেরা জায়গায় রাখতে হবে।
খামারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দর্শনার্থীদের জুতা-স্যান্ডেল, ছাগল, ভেড়া, বন্য পাখি রিকশাভ্যান ও মোটর গাড়ির মাধ্যমে আক্রান্ত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার খামারে রোগ ছড়াতে পারে। সে জন্য দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হবে।

পাশের খামারে যদি রোগ দেখা দেয়:
পাশের খামারে এই রোগ দেখা দিলে বুঝতে হবে, আপনার খামার এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। মনে রাখতে হবে, আপনার খামারটিও আক্রান্ত হতে পারে। তবে এ সময় অধৈর্য না হয়ে ঠান্ডা মাথায় কতগুলো মৌলিক নীতি অবলম্বন করতে হবে।
খামারের হাঁস-মুরগির জন্য সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নতুর হাঁস-মুরগি কিনবেন না। বহিরাগতদের কোনোভাবেই খামার শেডের কাছে আসতে দেওয়া যাবে না। খামারের আশপাশ, শেড, শেডের প্রত্যেকটি যন্ত্রপাতি এমনকি সাইকেল, মোটরসাইকেল নিয়মিত পরিষ্ককার রাখতে হবে। খামারের বর্জ্য ও বিষ্ঠা সুরক্ষিত জায়গায় রাখতে হবে।

যদি মড়ক লাগে:
খামারে মুরগির মৃত্যু বা মড়ক অনেক সময়ই হয় ও হতে পারে। যে কারণেই মড়ক লাগুক না কেন, দ্রুত নিকটস্থ পশুসম্পদ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। মনে রাখবেন, চোখে দেখে কোনোভাবেই বোঝা যাবে না মৃত্যুর কারণ বার্ড ফ্লু ভাইরাস কি না। রোগের কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য অবশ্যই ল্যাবরেটরি টেস্ট করাতে হবে। পাশুসম্পদ হাসপাতালের চিকিৎসক নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরিতে রক্তের নমুনা পাঠিয়ে পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর আপনাকে নিশ্চিত করবেন রোগের কারণ কী। যদি বার্ড ফ্লু ভাইরাস পাওয়া যায়, তাহলে নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে খামারের মুরগি নিধন ও ডিম নষ্ট করতে হবে এবং খামারের বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

করণীয়:

  • মুরগির মাংস ও ডিম ভালোভাবে রান্না ও সেদ্ধ করে খেতে হবে।
  • খাওয়ার আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • ডিম ফ্রিজে রাখার আগে হালকা গরম পানি বা ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ধুয়ে রাখতে হবে।
  • বাড়ির হাঁস-মুরগি খাঁচায় ভরে রাখুন বা কোনো নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না।
  • খামারে কাজ করার সময় মাস্ক, গ্লাভস বা দস্তানা এবং অ্যাপ্রোন পরে কাজ করতে হবে।
  • খামারের ফুটপথে পা ধুয়ে প্রবেশ করুন।
  • হঠাৎ জাবর কাশি, গলার স্বর ভেঙে গেলে, চোখে কোনো সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অনুচিত:

  • অতিথি পাখিদের শিকার ও খাওয়া যাবে না।
  • মুরগি কাটার ছুরি, বঁটি ও মাংস রাখার পাত্র গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে রাখতে হবে।
  • জীবন্ত মুরগি ছাড়া কোনো রোগগ্রস্ত মুরগি, হাঁস, কবুতর কেনা বা খাওয়া যাবে না।
  • খামার শেড থেকে শিশুদের দুরে রাখতে হবে।
  • খামারের অসুস্থ মুরগি খাওয়া যাবে না।
  • গুজব বিশ্বাস করা যাবে না।